web stats রোহিঙ্গাদের সকল ইতিহাস মুছে ফেলছে মিয়ানমার

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩ আশ্বিন ১৪২৭

রোহিঙ্গাদের সকল ইতিহাস মুছে ফেলছে মিয়ানমার

তিন মাসের বেশি সময় আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে নিধনযজ্ঞ শুরু করলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এদিকে মিয়ানমার সরকার যে পদ্ধতিগতভাবে দেশটি থেকে রোহিঙ্গাদের পরিচয় মুছে দিচ্ছে সেটিই উঠে এসেছে নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে। আরটিভির পাঠকদের জন্য এ প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো। ইউ কিয়াউ মিন যিনি একজন রোহিঙ্গা। তিনি রোহিঙ্গা ছাত্র পরিষদের একজন সদস্য ছিলেন। অধ্যয়ন করেছেন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। এমনকি ১৯৯০ সালের মিয়ানমারের বাতিল হওয়া সংসদ নির্বাচনে জয়ীও হয়েছিলেন। কিন্তু মিয়ানমার সরকারি তথ্যানুযায়ী, ইউ কিয়াউ মিনের সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোনো অস্তিত্ব নেই দেশটিতে। মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনে দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এখন তাদের বেশিরভাগই রাষ্ট্রহীন। তাদের পরিচয় স্বীকার করে না বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার। রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ইউ কিয়াউ সান হ্লা বলেন, রোহিঙ্গা বলতে কোনো কিছু নেই। এটা ভুয়া খবর। রোহিঙ্গাদের অস্বীকার করার এ ঘটনা ৭২ বছর ধরে মিয়ানমারে বাস করা কিয়াউ মিনকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছে। অথচ রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে কয়েক প্রজন্ম ধরে জাতিগোষ্ঠী হিসেবে বাস করে আসছে। এদিকে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংগঠনগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলছে, মিয়ানমারে সেনা অভিযানে রোহিঙ্গাদের ইতিহাসের মুছে ফেলা হচ্ছে। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর অভিযানকে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে। গেলো ২৫ আগস্ট রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান শুরু করে মিয়ানমার। সেনাবাহিনীর পদ্ধতিগত এ অভিযানে নিপীড়ন, হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচতে ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অক্টোবরে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোর সব চিহ্ন মুছে ফেলছে। এরমধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিজেদের গ্রাম ও বাসভূমিতে ফিরিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে করে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে রোহিঙ্গারা। ইয়াঙ্গুনের বাসিন্দা কিয়াউ মিন বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। শিগগিরই আমরা সবাই হয় মরে যাবো, নয়ত অন্য কোথাও চলে যাবো। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, রাখাইনে সামরিক অভিযানে ‘শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নেতা এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জ্ঞান ধ্বংস করার জন্যই এ পদক্ষেপ’। ইউ কিয়াউ হ্লা অং বলেন, আমাদের নিজস্ব ইতিহাস আর ঐতিহ্য রয়েছে। অং একজন রোহিঙ্গা আইনজীবী ও সাবেক রাজনৈতিক বন্দি। তার বাবা রাখাইনের রাজধানী সিতেতে আদালতের একজন কেরানি হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমরা কিছুই না, এই ভান তারা কিভাবে করতে পারে?’ টেলিফোনে দেয়া সাক্ষাৎকারে অং বলেন, রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে আমাকে বেশ কয়েকবার কারাগারে যেতে হয়েছে। এখন আমাকে পরিবারসহ সিতে ক্যাম্পে বাস করতে হচ্ছে। সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে ত্রাণ বিতরণের অনুমতি না দেয়ায় তার পরিবার খাদ্য সংকটে ভুগছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমারের এই ‘স্মৃতিভ্রম’ যেমন দৃঢ় তেমনি পরিকল্পিত। পাঁচ বছর আগে সিতে একাধিক জনগোষ্ঠীর একটি শহর ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ রাখাইন বৌদ্ধ সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায় পাশাপাশি বাস করতো। ২০০৯ সালেও রোহিঙ্গা মৎস্যজীবীরা রাখাইন নারীদের কাছে মাছ বিক্রি করতো। রোহিঙ্গারা আইনজীবী ও ডাক্তার হিসেবেও কাজ করতেন। শহরের প্রধান সড়কের পাশেই রয়েছে জামা মসজিদ। উনিশ শতকে নির্মিত এ মসজিদের ইমাম সিতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথা বলতেন গর্বের সঙ্গে। কিন্তু ২০১২ সালের জাতিগত দাঙ্গায় অনেক রোহিঙ্গা নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হন। পরে শহরটি একরকম মুসলিমমুক্তই করা হয়। সেখানে এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা যাদের নাগরিকত্ব ছিল তাদেরও ক্যাম্পে নিয়ে পোরা হয়েছে। কেড়ে নেয়া হয়েছে তাদের জীবিকাও। তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা থেকে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তারা ক্যাম্প থেকে অন্য কোথাও যেতে পারেন না। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে এক রোহিঙ্গা ব্যক্তিকে সিতের আদালতে হাজির হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয় একদল রাখাইন। সিতের জামা মসজিদটি এখন অব্যবহৃত ও ধসে পড়ছে। কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে মসজিদটিকে। মসজিদটির ৮৯ বছর বয়সী ইমামকে ক্যাম্পে বন্দি করা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনুচ্ছিক এক রোহিঙ্গা ব্যক্তি বলেন, মানুষ হিসেবে আমাদের কোনো অধিকার নেই। এটা রাষ্ট্র পরিচালিত জাতিগত শুদ্ধি অভিযান ছাড়া আর কিছুই নয়। এখন সিতে শহরের পারিপার্শ্বিকতাও বদলে গেছে। শহরটির বাজারের আশপাশের বাসিন্দারা মিথ্যা দাবি করেন যে, এখানে কখনো কোনো মুসলমান দোকানি ছিল না। সিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় কয়েকশ’ রোহিঙ্গা শিক্ষার্থী ছিলেন। এখন আছেন মাত্র জনা ত্রিশেক রোহিঙ্গা। এদের বেশিরভাগই দূরবর্তী শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে পড়াশোনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ইউ সোয়ে খাইং কিউয়াও বলেন, কোনো ধর্মের মানুষের প্রতি আমাদের নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু তারাই (রোহিঙ্গা) আসে না। কিয়াউ মিন একসময় সিতে-তে শিক্ষকতা করতেন। তার শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ ছিলেন রাখাইন বৌদ্ধ। কিন্তু এখন ওই বৌদ্ধ শিক্ষার্থীরাই তার সঙ্গে কথা বলতে বিব্রতবোধ করে বলে জানাচ্ছেন কিয়াউ মিন। কিয়াউ মিনের ভাষায়, তারা দ্রুত আলোচনা শেষ করতে চায়। কারণ আমি কে বা কোথা থেকে এসেছি সেটি নিয়ে তারা মোটেই ভাবতে চায় না। ১৯৯০ সালে কিয়াউ মিন বর্তমানে ক্ষমতাসীন অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) সঙ্গে জোটবদ্ধ অবস্থায় রোহিঙ্গা পার্টির হয়ে একটি সংসদ আসনে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু দেশটির সামরিক সরকার ওই নির্বাচনের ফল বাতিল করে। কিয়াউ কারাবন্দি হন। রোহিঙ্গারা কয়েক প্রজন্ম ধরে রাখাইনে বাস করেছেন। তাদের বাংলা উপভাষা ও দক্ষিণ এশীয় চরিত্রের কারণে রাখাইনের বৌদ্ধদের চেয়ে তাদের আলাদা মনে করা হয়। ঔপনিবেশিক আমলে দক্ষিণ এশিয়ার ধনী কৃষক, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মচারীরা তৎকালীন বার্মায় বসতি গড়ে তোলে। নতুন আসা মানুষদের অনেকেই রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিশে যায়। ওই সময় তারা রোহিঙ্গা আরাকানি ভারতীয় বা আরাকানি মুসলিম হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৩০’র দশকে ইয়াঙ্গুনে দক্ষিণ এশীয় মুসলমান ও হিন্দুরা সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে অনেক বৌদ্ধ নিজেদের ভিনদেশী মনে করতে শুরু করেন। বর্ণবাদী জেনারেল নে উইনের প্রায় অর্ধশতাব্দীর সামরিক শাসনামলে কয়েক লাখ দক্ষিণ এশীয় বার্মা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায়। পশ্চিমাঞ্চলীয় বার্মার রাখাইনে ইসলাম ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। কেননা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাখাইনরা অক্ষ শক্তিকে আর রোহিঙ্গারা মিত্রশক্তিকে সমর্থন দেয়। পরে রোহিঙ্গাদের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী বার্মা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করে। তখন তারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) অংশ হওয়ার চেষ্টা করে। যেটি পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলে। ১৯৮০ দশকে সামরিক জান্তা বেশিরভাগ রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়। সেসময়ের ভয়াবহ নিপীড়নেও পালিয়ে আসে অনেক রোহিঙ্গা। বর্তমানে মিয়ানমারের চেয়ে দেশটির বাইরেই বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করে। যাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়াতে বসবাস করেন। নিজেদের জন্মভূমির চেয়ে বাইরেই তাদের বেশি বসবাস। মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের দশকগুলোতে রোহিঙ্গাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। তখন দেশটির শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান র‌্যাঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের আলাদা একটি ইউনিয়নও ছিল। স্বাধীনতার পর দেশটির প্রথম নেতা ইউ নু’র মন্ত্রিসভাতেও একজন রোহিঙ্গা ছিলেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া ওই মন্ত্রী নিজেকে আরাকান মুসলিম হিসেবেই পরিচয় দিতেন। এমনকি জেনারেল নে উইনের সময়ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বেতার থেকে রোহিঙ্গা ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হতো। এমনকি সংসদে রোহিঙ্গা নারীদের প্রতিনিধিত্বও ছিল। রাখাইনের বুথিয়াডং শহরে উ শোয়ে মং ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সেনাবাহিনীর প্রক্সি দল ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির সদস্য ছিলেন তিনি। কিন্তু ২০১৫ সালের নির্বাচনে তাকে দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে তখন ভোটদানে বাধা দেয়া হয়। শোয়ে মংয়ের জেলায় ৯০ শতাংশই রোহিঙ্গা। কিন্তু সেখানকার জনপ্রতিনিধি একজন রাখাইন বৌদ্ধ। গেলো সেপ্টেম্বরে একজন স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা শো মংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ফেসবুকের মাধ্যমে তিনি সহিংসতা ছড়িয়েছেন। রাখাইনে সেনাবাহিনীর নিধনযজ্ঞ বন্ধের আহ্বানের কারণে তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হয়। শোয়ে মংয়ের বাবাও একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। শোয়ে মং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে আছেন। তবে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘তারা সব রোহিঙ্গাকে সন্ত্রাসী বা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু আমরা তেমন নই। এ/জেএইচ

এই বিভাগের আরো খবর


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com