web stats জুনায়েদ খান বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অধিনায়ক হিসেবে দেখছেন মাহমুদউল্লাহকে

মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮

জুনায়েদ খান বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অধিনায়ক হিসেবে দেখছেন মাহমুদউল্লাহকে

খুলনা টাইটান্সের হয়ে বিপিএল খেলতে আসা এ ক্রিকেটার গতকাল বিকেলে মুখোমুখি হয়েছিল। দীর্ঘ আলোচনায় ক্রিকেটার হয়ে উঠার গল্প, বিপিএল, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে কথা বলেছেন পাকিস্তানকে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির স্বাদ দেওয়া জুনায়েদ। পাঠকদের জন্য তা দেয়া হল :

প্রতিবেদক: খুলনা টাইটান্স খুব ভালো করছে। বিপিএল কতটুকু উপভোগ করছেন?

জুনায়েদ খান : আমি বিপিএল বেশ উপভোগ করি। গত বছরও বেশ উপভোগ করেছি। কারণ যখনই আমি বাংলাদেশে আসি মনে হয় আমি পাকিস্তানেই আছি।

প্রতিবেদক: খুলনা বিপিএলে এখন পর্যন্ত পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে। এটা তো নিশ্চয়ই স্বস্তির জায়গা?

জুনায়েদ খান : অবশ্যই। আমাদের টার্গেট চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আমরা খুশি যে আমরা এখনও টপ অফ দ্য টেবিলে রয়েছি। তারপরও আমাদেরকে অনেক দূর যেতে হবে। আমরা তখনই স্বস্তি পাব যখন খুলনাকে চ্যাম্পিয়ন করাতে পারব।

প্রতিবেদক: কোচ হিসেবে মাহেলা জয়াবর্ধনকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন। তার সঙ্গে তো প্রথমবারের মতো কাজ করছেন?

জুনায়েদ খান : হ্যাঁ, প্রথমবারের মতো মাহেলা জয়াবর্ধনের কোচিংয়ে খেলছি। ক্রিকেটে সে লিজেন্ড। যেভাবে সে তার অভিজ্ঞতা এবং ক্রিকেট জ্ঞান আমাদের সঙ্গে শেয়ার করে; শুধু আমি না আমাদের দলে থাকা প্রত্যেকেই উপকৃত হচ্ছে। দারুণ। আমি তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারছি। আমার প্রত্যাশা তার থেকে পাওয়া জ্ঞান আমার ভবিষ্যতে কাজে আসবে।

প্রতিবেদক: গত বছর বিপিএলে ২০ উইকেট পেয়েছিলেন। এ বছর মাঝপথে বিপিএলে যোগ দিলেন। কোনো লক্ষ্য অবশ্যই আছে…

জুনায়েদ খান : আসলে আমার লক্ষ্য বেশ সহজ। আমি সব সময় ম্যাচ বাই ম্যাচ পরিকল্পনা করি। আমি সব সময় দলকে জেতাতে সহায়তা করি। হয়তো সেটা এক উইকেট দিয়ে হোক অথবা উইকেট ছাড়াও। আমার লক্ষ্য দলকে জেতানো এবং দলের জয়ে অবদান রাখা।

প্রতিবেদক: বিপিএলে মাহমুদউল্লাহর অধিনায়কত্ব নিয়ে কিছু বলুন।

জুনায়েদ: মাহমুদউল্লাহর নেতৃত্ব অসাধারণ। ধোনি আর মিসবাহর মতো ঠাণ্ডা মাথার অধিনায়ক তিনি। তিনি সব সময় সিনিয়রদের সম্মান করেন এবং তাদের প্রয়োজন মতো পরামর্শ দেন। কোনও বোলার, ব্যাটসম্যান কিংবা ফিল্ডার ভুল করলে তিনি এগিয়ে এসে পরামর্শ দেন। মাহমুদউল্লাহ কখনোই রেগে যান না, আর ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

প্রতিবেদক: ভবিষ্যতে মাহমুদউল্লাহকে আপনি বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে দেখতে চান?

জুনায়েদ খান : অবশ্যই। কেন নয়। সে ভালো একজন প্রার্থী। খুলনা টাইটান্সকে সে যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে তা সত্যিই দারুণ। আইসিসি ইভেন্টগুলোতে দারুণ পারফরম্যান্স করছে সে। মাশরাফির পর, সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে মাহমুদউল্লাহ, সাকিব এবং তামিম রয়েছে। তবে আমার ভোট যাবে মাহমুদউল্লাহর পক্ষে।

প্রতিবেদক: আপনার শহর থেকে পাকিস্তানের প্রথম ক্রিকেটার যিনি জাতীয় দলে খেলেছেন? ক্রিকেটার হিসেবে উঠা আসার গল্পটা যদি বলতেন….

জুনায়েদ খান : আমি গ্রাম থেকে এসেছি। আমি যখন ক্রিকেট খেলা শুরু করি সেখানে ক্রিকেট অনেকেই বুঝত না। গ্রামে কোনো ক্রিকেট মাঠও ছিল না। ক্রিকেট খেলার জন্য আমাকে অনেক দূর যেতে হয়েছে। আবার আমার পরিবার সব সময় আমার পড়শোনার উপর জোর দিয়েছে। ক্রিকেট এবং পড়াশোনা দুটা একই সঙ্গে চালানো কঠিন ছিল। আমার বাবা এবং কাজিনরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং সমর্থন করেছিল। আমি বেশ কষ্ট করেছি। মুসলমান হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, যদি আমি কঠোর পরিশ্রম করি এবং সৎ থাকি তাহলে অবশ্যই ফল পাব।

প্রতিবেদক: এখন সেখানে ক্রিকেট কতটুকু এগিয়েছে?

জুনায়েদ খান : আমি যেহেতু অনেক কষ্ট করে ক্রিকেটার হয়েছি আমি চাচ্ছিলাম আমার গ্রামের ছেলেরা সেই কষ্টটা না করুক। তাই আমি একাডেমি করার চেষ্টা করি। ২০১২ সালে আমি দাগি, সোয়াবিতে একটি একাডেমি করি। যেখানে ছেলেরা ফ্রিতে খেলাধুলা করতে পারছে। এখন সেখানে ৫০-৬০ খেলোয়াড় অনুশীলন করছে। আমার একাডেমির ৩-৪টা ছেলে এখন অ্যাবোটাবাদের হয়ে পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছে। ২-৩ জন পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলেছে। আমার এখন লক্ষ্য আমার একাডেমিকে আরও বড় করা যাতে ১০০-১২০ খেলোয়াড় একাডেমিতে অনুশীলন করতে পারে এবং নিজেদেরকে ক্রিকেটার হিসেবে প্রস্তুত করতে পারে।

প্রতিবেদক: কেন নিজেকে বোলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন? চাইলে তো ব্যাটসম্যানও হতে পারতেন…
জুনায়েদ খান : আসলে কেন যে বোলার হলাম তা নিজেও জানিনা। হয়ত প্রাকৃতিকভাবেই হয়েছে। আবার অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে। খেলাধুলার জন্য আমাকে আমাকে অনেক দূর যেতে হয়েছে। মোটরবাইকে করে অনুশীলনে যেতাম। মোটরবাইকে বড় কিট ব্যাগ নিয়ে যাতায়াত করা কঠিন ছিল। এ কারণে ছোট কিছু নিয়ে ট্রাভেল করা ছিল আমার জন্য স্বস্তিদায়ক। যেমনটা বোলার হিসেবে করতে পেরেছি। শুধু জুতা (কেডস) এবং ট্রাউজার একটি ছোট্ট ব্যাগে নিয়ে যাতায়াত করেছি। হয়ত এ কারণে ব্যাটসম্যান না হয়ে আমি পেসার হয়েছি।

প্রতিবেদক: আপনাকে প্রথম কে বল কিনে দিয়েছিল?

জুনায়েদ খান : আমরা প্রথমে টেপ টেনিস বলে খেলা শুরু করি। সে সময়ে আমরা টেপ এবং বল কিনতাম। বাবা পয়সা দিত এবং আমি সেই টাকা নিয়ে বল ও টেপ কিনতাম।

প্রতিবেদক: শৈশবে আপনার বোলিং আইডল কে ছিল?

জুনায়েদ খান : আমি যদি আমার জীবন-যাপনের কথা চিন্তা করি তাহলে বলব, ইমরান খানের কথা। কারণ আমার মতো উনিও বেশ কষ্ট করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। আমার ক্রিকেটার হওয়ার পিছনে তার জীবন-যাপন অনেকটা প্রভাব ফেলেছে। আর আমার বোলিং আইডল ওয়াসিম আকরাম। ওয়াসিম আকরাম একজন কিংবদন্তি। আমি বাঁহাতি পেসার হিসেবে তাকে বেশ ফলো করি। আমি বেশ ভাগ্যবান যে মুলতান সুলতানে তার অধীনে আমি খেলার সুযোগ পাচ্ছি।

প্রতিবেদক: আপনি ল্যাঙ্কশায়ারের হয়ে দীর্ঘদিন কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছেন। কাউন্টি ক্রিকেট কিভাবে আপনার পারফরম্যান্স এবং স্কিলের উন্নতি করেছে?

জুনায়েদ খান : এটা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। বিপিএলও তাই। আমি সব সময় দীর্ঘসময় নিয়ে এক দলে খেলার চেষ্টা করি। লোকে বলে না, ‘যদি পাথর একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্থাপন করা হয় তবে এটি পাথর হিসাবে না সম্পদ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। ’ এ কারণে আমি দীর্ঘ সময় একটি দলে খেলার চেষ্টা করি। আমি ল্যাঙ্কশায়ারে ৪-৫ বছর ধরে খেলছি। আমি সেখানে অনেকটাই স্থানীয় হয়ে গেছি। কাউন্টির অভিজ্ঞতা আমার দারুণ। আমি যখন সেখানে গিয়েছি তখন পিটার মুরসের সঙ্গে দীর্ঘসময় কাজ করি। তার কাছ থেকে অনেক কিছু জেনেছি।

প্রতিবেদক: চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ের পর জীবন কতটা পাল্টেছে?

জুনায়েদ খান : আমার জীবন-যাপন তেমন একটা পাল্টায়নি। তবে পাকিস্তানের ক্রিকেট অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে। পাকিস্তানে কোনো ক্রিকেট হচ্ছিল না, আমরা ওয়ানডেতে ক্রিকেটে সাত-আটে নেমে পড়েছিলাম। ভক্ত এবং সমর্থকরা পাকিস্তানকে নিয়ে আশা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ের পর আমরা পাঁচ-ছয়ে উঠে যাই এবং সমর্থকরা আবারও আমাদেরকে নিয়ে নতুন আশা দেখতে শুরু করে।

প্রতিবেদক: আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশের ফাইনাল খেলার সুযোগ ছিল?

জুনায়েদ খান : অবশ্যই বাংলাদেশের ক্রিকেট যথেষ্ট উন্নতি করেছে। অনেকেই আগে চিন্তা করত বাংলাদেশের বিপক্ষে সহজেই জিতে যাবে। কিন্তু সময় এখন পরিবর্তন হয়েছে। তারা নিজেদের মাটিতে ইংল্যান্ডকে টেস্টে ও ওয়ানডেতে হারিয়েছে। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেছে এবং ভারতের বিপক্ষেও ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে। তারা দারুণভাবে উন্নতি করেছে। হয়ত বিপিএলও উন্নতির পিছনের অনেক বড় কারণ। কারণ তরুণ ক্রিকেটাররা এখানে খেলছে। হ্যাঁ এটা সত্য আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম বাংলাদেশও ভারতের বিপক্ষে দ্বিতীয় সেমিফাইনাল জিততে পারে। যেটা হয়েছে সেটা ভুলে যাওয়া ভালো। বাংলাদেশ হেরেছে এবং এটা খেলার একটা অংশ।

প্রতিবেদক: ভারতের বিপক্ষে তো আপনারা সহজেই জিতেছিলেন। বাংলাদেশ কি আপনাদের আরও প্রতিদ্বিন্দ্বিতা জানাতে পারত? আপনি কি মনে করেন?

জুনায়েদ খান : আসলে এভাবে চিন্তা করছি না। খেলোয়াড় হিসেবে ভাবছি আমাদের প্রতিপক্ষ যেই হবে তাদের বিপক্ষেই আমরা খেলতে পারব। ভারত কিংবা বাংলাদেশ যেই হোক আমাদের প্রস্তুতি একই হবে। ফাইনালে যখন একটি দল আসে তার মানে তারা টুর্নামেন্টে খুব ভালো খেলেই ফাইনালে উঠেছে। ভারতও তাই।

প্রতিবেদক: মোহাম্মদ আমির ফিরে আসায় আপনার ও তার সঙ্গে একটা প্রতিদ্বন্দ্বীতা হচ্ছে? এটা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি?

জুনায়েদ খান : আমি বিশ্বাস করি আপনি যদি পারফরম্যান্স করেন তাহলে যেকোনো দলে আপনার জায়গা হবে। যেমন- আমি এখন টেস্ট স্কোয়াডের বাইরে। কারণ আমি টেস্ট ক্রিকেটে ভালোভাবে পারফর্ম করিনি যার কারণে বাদ পড়েছি। আমি ওয়ানডে স্কোয়াড থেকেও বাদ পড়েছি। তারপর আমি কঠোর পরিশ্রম করে এবং পারফর্ম করে আবার নিজের জায়গা ফিরে পাই। এটাই নিয়ম।

এটা আমার জন্য যা, আমিরের জন্য এবং দলের প্রত্যেকের জন্য একই। পাশাপাশি যখন একটি দলে সাইড বেঞ্চ শক্তিশালী হয় তখন তারা ভালো চিন্তা করতে পারে। খেলোয়াড়রাও তখন কঠোর পরিশ্রম করে নিজের জায়গা ধরে রাখার জন্য এবং বাইরে যারা থাকে তারা পরিশ্রম করে সুযোগের জন্য। দিনশেষে এটা খেলোয়াড়দের জন্য বেশ ভালো।

প্রতিবেদক: আগামী পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

জুনায়েদ খান : পাঁচ বছর তো অনেক লম্বা সময়। বিশেষ করে পেসারদের জন্য। আমি আগেও বলেছি আমি ম্যাচ বাই ম্যাচ চিন্তা করি। আমি এখন বিপিএল নিয়ে চিন্তা করছি। এরপর টি-১০ খেলতে যাব। এরপর নিউজিল্যান্ড সিরিজ রয়েছে। আপাতত এগুলোই আমার চিন্তায় রয়েছে।

প্রতিবেদক: ইংল্যান্ডে পাকিস্তান চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতেছে। ২০১৯ বিশ্বকাপ জয়ের কতটুকু সুযোগ আছে পাকিস্তনের?

জুনায়েদ খান : এখনই এটা বলা কঠিন। অনেক সময় পড়ে আছে। র‌্যাঙ্কিংয়ের এক থেকে আট পর্যন্ত যারাই আছে তাদের প্রত্যেকেরই স্বপ্ন বিশ্বকাপ জেতার। পাকিস্তানেরও তাই। আমাদের কোচ মিকি আর্থার ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল গঠন করার চেষ্টা করছেন। এ দলটি যদি এক-দুই বছর ধারাবাহিক এবং একই সঙ্গে খেলতে পারে তাহলে বড় সাফল্য পেতেও পারে

এই বিভাগের আরো খবর


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com