web stats যে যন্ত্রণা বুকে নিয়েই চলে গেলেন রীতা

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ৪ কার্তিক ১৪২৭

যে যন্ত্রণা বুকে নিয়েই চলে গেলেন রীতা

দীর্ঘদিনের একটা আক্ষেপ রয়েই গেল। আক্ষেপের চেয়েও যন্ত্রণা বেশি। প্রাপ্য জাতীয় পুরস্কার না পাওয়ার বেদনা বহুদিন তাঁকে কুড়ে খেয়েছিল। সেই ব্যাথা বুকে নিয়ে অচিরেই চলে গেলেন টলিপাড়ার অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র রীতা কয়রাল। সিনেদুনিয়ার কেউকেটাদের ষড়যন্ত্রের শিকার বলা যেতে পারে এই ঘটনাকে। প্রবাদপ্রতিম পরিচালক প্রয়াত ঋতুপর্ণ ঘোষের বহুবন্দিত ছবিতে থেকেও তাঁকে থাকতে হয়েছিল অন্তরালে।

২০০০ সালে ‘বাড়িওয়ালি’ ছবির জন্য অভিনেত্রী কিরন খের-এর পাশাপাশি ডাবিংয়ের জন্য রীতা কয়রালের নামও বিবেচনা করেছিলেন জাতীয় পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলী। কিন্তু ছবির অন্যতম প্রযোজক যে ছিলেন অনুপম খের। স্ত্রীকে পুরস্কার পাওয়ার জন্য খেলেছিলেন ঘৃণ্যতম চাল। সেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে জাতীয় পুরস্কার অধরাই থেকে যায় রীতা। সম্প্রতি একটি টিভি শোয়ে প্রকাশ্যে আনেন ১৭ বছর আগের সেই ঘটনা। আক্ষেপ নিয়েই চিরঘুমে চলে গেলেন প্রতিভাবান এই অভিনেত্রী।

নয়ের দশকে যখন অঞ্জন চৌধুরি, স্বপন সাহা, তরুণ মজুমদাররা মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের চালচিত্র রুপোলি পর্দায় ফুটিয়ে তুলছেন, সেইসময় আবির্ভাব রীতা কয়রালের। প্রধানত খল চরিত্রের জন্যই তাঁর অল্পসময়ের স্ক্রিন প্রেজেন্স মন কেড়েছিল বাঙালি দর্শকদের। হিংসুটে কাকিমা বা রাগী বউদি আবার কখনও বা বদমেজাজি বউয়ের চরিত্রে রীতা কয়রালের জুড়ি মেলা ছিল ভার। সংঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রীতা কয়রালের কথাই প্রথমে মাথায় আসত পরিচালকদের। কিন্তু নবীন বয়সেও কখনও নায়িকার চরিত্র জোটেনি তাঁর। বরাবরই নেগেটিভ চরিত্র করতে করতে একটা সময় বোর হয়ে গিয়েছিলেন অভিনেত্রী। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকতে গেলে এ ছাড়া উপায়ও নেই।

২০০০ সালে সুযোগ আসে ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবিতে কাজ করার। তবে তা নেপথ্যে কিরন খের-এর কন্ঠ দেওয়ার জন্য। তাই সই। এসব কাজে খুব বেশি পারিশ্রমিক মেলে না। তবে সেসব ভেবে কাজ করেননি রীতা। বরং একজন শিল্পীর যা করা উচিত তাই মন দিয়ে করেছেন।

যখন ছবিটি জাতীয় পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয় তখনই হয় গোলমাল। বিচারকমণ্ডলীর মধ্যে ছিলেন পরিচালক গৌতম ঘোষ, রমেশ গান্ধী ও অপর্ণা সেন। কিরণের মুখে রীতার স্বর বুঝতে অসুবিধা হয়নি তাঁদের। সম্প্রতি একটি টিভি শোয়ে সেবিষয়ে প্রথম মুখ খোলেন রীতা।

ডাবিংয়ের জন্যও যে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া যেতে পারে সেকথা জানতে পেরে গৌতম ঘোষের কাছে স্বীকার করেন রীতা যে, এই স্বর তাঁরই। ব্যস, মিডিয়ায় জানাজানি হতেই বেঁকে বসেন পরিচালক ঋতুপর্ণ। তিনি একথা অস্বীকার করেন। তখনই মুম্বই থেকে রীতার কাছে ফোন আসে ছবির অন্যতম প্রযোজক অনুপম খের-এর। ডাবিংয়ের জন্য আরও মোটা টাকার পারিশ্রমিক অফার করেন অনুপম।

তবে একটাই শর্ত, ডাবিংয়ের কথা কাউকে বলা যাবে না। কিন্তু তা করতে অস্বীকার করায় অনুপম রীতাকে হুমকিও দেন বলে অভিযোগ। বলিউডে তো বটেই এমনকী টালিগঞ্জেও রীতার কাজ পাওয়া মুশকিল করে দেবেন বলে হুমকি দেন। কিন্তু সেদিন অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়ার পরিণামে জাতীয় পুরস্কার জোটেনি অভিনেত্রীর। শেষদিকে টেলিভিশন সিরিয়ালে কাজ করছিলেন রীতা।

জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘রাখিবন্ধন’-এর অন্যতম প্রধান চরিত্রে ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের সহকর্মী দোলন রায় তাঁর মৃত্যুর পর আক্ষেপ করে বলেছেন, লিভার ক্যানসারের কথা অনেক পরে জানা যায়। ব্যাথায় কাঁদতে কাঁদতে নাকি শট দিতেন রীতা। ইন্ডাস্ট্রির হেভিওয়েটদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে যেতে পারেননি তাই শিকেয় জাতীয় পুরস্কার ছেঁড়েনি। কে না জানে, পুরস্কার শুধু প্রতিভা থাকলেই জোটে না। সেই ধ্রুবসত্য মেনে নিয়েই চিরশূন্যে বিলীন হলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

এই বিভাগের আরো খবর


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com