web stats মুসলমানদের অনৈক্য আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা! মুসলমানদের মাঝে ঐক্য কিভাবে সম্ভব

মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮

মুসলমানদের অনৈক্য আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা! মুসলমানদের মাঝে ঐক্য কিভাবে সম্ভব

আল্লাহ তায়ালা বলছেন, হে ঈমানদারগণ! ভয় করো আল্লাহকে যেভাবে তোমাদের ভয় করা উচিত তাঁকে এবং অবশ্যই ইসলামে দাখিল না থাকা অবস্থায় মারা যেয়ো না। আর আল্লাহর রজ্জুকে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে শক্তভাবে ধারণ করো এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যেয়ো না; এবং কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করো তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ; যা তিনি তোমাদের দান করেছেন। কারণ, তোমরা ছিলে শত্রু আর তিনি তোমাদের হৃদয়কে ভালোবাসার মাধ্যমে জুড়ে দিয়েছেন যার ফলে তাঁর দয়ায় তোমরা হয়ে গেছ ভাই; এবং তোমরা ছিলে আগুনেভরা গর্তের কিনারায়, আর তিনি তোমাদের তা থেকে রক্ষা করেছেন। এভাবে আল্লাহ তাঁর নিদর্শনগুলো তোমাদের জন্য স্পষ্ট করে দেন যাতে তোমরা সুপথ লাভ করতে পারো।

তোমাদের মধ্য থেকে এমন একদল লোক বেরিয়ে আসুক যারা ভালো সব কিছুর প্রতি আহ্বান জানাবে, সৎ কাজের দেবে নির্দেশ এবং নিষেধ করবে মন্দ কাজে; তারাই হবে সফলকাম। ওদের মতো হয়ো না যারা নিজেরাই বিভক্ত এবং সুস্পষ্ট নিদর্শন লাভের পরও এ নিয়ে বিরোধিতায় লিপ্ত হয় : তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি। (আলে ইমরান, আয়াত ১০২-১০৫)

আরেকটি আয়াতে আমরা পড়ি : যারা তাদের ধর্মকে বিভক্ত করে এবং বিভিন্ন দলে খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়, তাদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্কই নেই। তাদের বিষয়টি আল্লাহ তায়ালার কাছে সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দেবেন যা কিছু ওরা করে থাকে। (আল আনআম, আয়াত ১৫৯)

আমরা আরো পড়ি : আর আনুগত্য করো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এবং কোনো বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, পাছে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। (আল আনফাল, আয়াত ৪৬)

মুসলমানদের অনৈক্য আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বর্তমানে আমরা খুবই বিখণ্ডিত ও বিভক্ত একটি জাতি। আমাদের জনগোষ্ঠীর প্রতিটি স্তরেই রয়েছে অনৈক্য স্থানীয় পর্যায়, জাতীয় পর্যায় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। আমরা ঐক্য নিয়ে কথা বলি এবং অনৈক্যের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করি আমাদের সভা-সম্মেলনে। কিন্তু আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হই। আমরা ব্যর্থ হই একত্রে কাজ করতে; যদিও আমাদের ধর্ম ও পরিস্থিতি সব দিক দিয়ে দাবি করছে যে, আমরা একত্র হই এবং কাজ করি একসাথে।

ঐক্য আমাদের জন্য ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। ইসলামে ঐক্য ও ঈমান পরস্পর সম্পর্কিত। ঈমানদার বা বিশ্বাসী মানে ঐক্যবদ্ধ মানুষ। তাদের মধ্যে ঈমান যত বেশি থাকবে, তারা তত বেশি ঐক্যবদ্ধ হবে। আল্লাহতায়ালা আল কুরআনে বলছেন : প্রকৃতপক্ষেই ঈমানদাররা পরস্পরের ভাই (আল হুজুরাত আয়াত ১০)

হজরত আবু হুরায়রাহ রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেছেন, ‘তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে যে পর্যন্ত না তোমাদের ঈমান থাকবে,্ এবং তোমরা ঈমান লাভ করতে পারবে না যে পর্যন্ত না তোমরা একে অন্যকে ভালোবাসো। আমি কি তোমাদের এমন কোনো কিছুর কথা বলব যা করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে? তোমাদের মধ্যে সালাম দেয়ার বিস্তার ঘটাও (মুসলিম)।

যখন আমরা ঐক্য নিয়ে কথা বলি, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত ঐক্য বলতে সব দিক দিয়ে এক রকম হওয়া বোঝায় না। এটা এ কথা বোঝায় না যে, আমাদের একই রকম দেখাবে : আমরা একই জিনিস খাব; পরব একই পোশাক। ঐক্য অর্থ এটা নয় যে, আমাদের মাঝে মতামতের কোনো পার্থক্য থাকবে না। কারণ, এসব হলো বৈচিত্র্য, অনৈক্য নয়। ঐক্য মানে বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা নয়। বৈচিত্র্য ভালো আর অনৈক্য মন্দ। বৈচিত্র্য আল্লাহর রহমত; অনৈক্য অভিশাপ। বৈচিত্র্যের মাধ্যমে ঐক্য অর্জিত হতে পারে।

ঐক্য বলতে বোঝায় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ঐক্য। যদিও ঐক্যবদ্ধ মানুষের মাঝে বৈচিত্র্য থাকে, তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কিন্তু এক ও অভিন্ন। তাদের অবশ্যই এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে এবং তাদের যাবতীয় প্রয়াস অবশ্যই সে লক্ষ্যে পরিচালিত হতে হবে। যখন বিচিত্র পটভূমি ও সংস্কৃতির মানুষ একটি লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়, তারা অগ্রগতি ও সাফল্য অর্জন করে।

মুসলিম হিসেবে আমাদের লক্ষ্য নৈতিক ও আধ্যাত্মিক। আমাদের উদ্দেশ্য আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করা এবং এই পৃথিবীতে তাঁর ধর্মের অগ্রগতির জন্য কাজ করে যাওয়া। আমাদের লক্ষ্য পরকালে চূড়ান্ত সাফল্য ও মুক্তি। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পেছনে এর চেয়ে উত্তম কোনো যুক্তি নেই। যদি আমরা আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা মনে রাখি, আমরা সহজেই আমাদের পার্থক্যগুলো অতিক্রম করতে পারব না। তখন আমরা খুঁটিনাটি বিষয়ে বিতণ্ডায় লিপ্ত হব না; কিংবা গুরুত্বহীন ঝগড়ায় অংশ নেব না। আমরা পরস্পরের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হব না, একে অপরকে করব না ঘৃণা। কে কৃতিত্বটা বাগিয়ে নিচ্ছে, তা নিয়ে তখন আমাদের দুশ্চিন্তা থাকবে না। কেননা, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আমাদের প্রভুকে খুশি করা।

আমাদের অহংবোধের সন্তুষ্টি কিংবা নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধি আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা দেখব আল্লাহর দ্বীন বা ধর্মের যথোপযুক্ত গুরুত্ব ও মর্যাদা দেয়া হচ্ছে কি না এবং আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত হবে কি হবে না। এটা আমাদের আরো উদারমনা, আরো পরোপকারী, অধিকতর ক্ষমাশীল এবং পরস্পরের প্রতি আরো বেশি দয়ালু করে তুলবে।

ঐক্য নিছক স্লোগান নয়। এটা একটা মিশন। আমরা যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের মাঝে কিভাবে ঐক্য গড়ে তোলা যায়, সেটা দেখা উচিত।

আমাদের প্রত্যেকেই (তিনি নারী বা পুরুষ যা-ই হোন না কেন) নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে : আমি কি অন্যান্য মুসলমানের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে চাই? আমার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আমি অন্যদের সাথে মিলে কী কাজ করছি? যদি আমার কোনো সমস্যা থাকে, এর সমাধানের জন্য আমি কী করছি? ঐক্য তো আকাশ থেকে পড়বে না বৃষ্টির মতো। ঐক্য কোনো অলৌকিক ব্যাপার নয় যে, ঐক্যে যারা বিশ্বাস করে না, তাদের মাঝে হঠাৎ ঐক্য ঘটে যাবে। যদি আমরা ঐক্যের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাই এবং কঠিন পরিশ্রম করি, কেবল তখনই ঐক্য আসবে। এটা হলো ঈমান, আন্তরিক প্রচেষ্টা, প্রচুর ধৈর্য, শুভেচ্ছা, সহিষ্ণুতা এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের প্রতি সৎ অঙ্গীকারের পুরস্কার। ঐক্যের জন্য চাই অব্যাহত প্রয়াস।

হজরত সা’দ বিন ওয়াক্কাস রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেছেন একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলিয়াহ (মদীনার একটি জায়গা) থেকে আসার পথে বানু মুয়াবিয়াহর মসজিদ অতিক্রম করছিলেন। তিনি এই মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং দু’রাকাত নামাজ পড়লেন। আমরাও তাঁর সাথে পড়লাম। তিনি তাঁর প্রভুর দরবারে দীর্ঘক্ষণ প্রার্থনা করলেন। এরপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, আমি আমার প্রভুর কাছে তিনটি জিনিস চেয়েছি। তিনি দুটো মঞ্জুর করেছেন আমার জন্য। তবে একটি নাকচ করেছেন। আমি আমার প্রভুকে বলেছি, দুর্ভিক্ষ দিয়ে আমার উম্মাহকে ধ্বংস না করতে। তিনি এটা কবুল করেছেন। তাঁকে বলেছি আমার উম্মাহকে বন্যা দিয়ে ধ্বংস করে না দিতে। তিনি এটা কবুল করেছেন। আমি তাঁকে বলেছি যাতে আমার লোকেরা পরস্পর হানাহানি না করে। তিনি এই অনুরোধ রাখেননি।’ (মুসলিম)

এই হাদিসের ভাষ্যকাররা বলেছেন, এর অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দুর্বিপাক থেকে বাঁচাবেন এবং পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মতো শাস্তি তাদের দেবেন না। তবে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের ব্যাপারে বলতে গেলে, উম্মাহকে নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে হবে এর হাত থেকে।
আসুন, আমাদের মধ্যে ঐক্যের জন্য আমরা সবাই একত্রে কাজ করি এবং এই প্রয়াসে আমাদের প্রতি রহমত বর্ষণের জন্য আল্লাহর কাছে মোনাজাত করি। আমীন

ভাষান্তর : মীযানুল করীম
লেখক : ফিকাহ কাউন্সিল অব নর্থ আমেরিকার সভাপতি

এই বিভাগের আরো খবর


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com