web stats যেখানে বাসর রাতে এক নারীর মিলনের অভিজ্ঞতা বিভীষিকাময়

বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

যেখানে বাসর রাতে এক নারীর মিলনের অভিজ্ঞতা বিভীষিকাময়

‘বিয়ের পর যখন তিনি আমার সামনে পোশাক খুলতে শুরু করেন, তখন আমি ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম,’ বলছিলেন এলমিরা (ছদ্মনাম)।

‘আমি বার বার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে এখন আমার বিয়ে হয়ে গেছে। তাই আমার সাথে এগুলোই হবে।’

এলমিরার তখন বয়স ছিল ২৭ বছর। সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে একজন দোভাষী হিসেবে কাজ শুরু করেছেন।

এলমিরার স্বামীকে বেছে নিয়েছিলেন তার বাবা-মা। এলমিরা সেই বিয়েতে সম্মতিও জানিয়েছিলেন। শুধুমাত্র তার ‘মা’কে খুশি করতে’।

‘ওই লোকটি ছিল আমাদের প্রতিবেশী, আমরা একেবারে আলাদা মানুষ ছিলাম; সে শিক্ষিত ছিল না, আমাদের মধ্যে কোন কিছুতেই কোন মিল ছিল না,’ বলেন এলমিরা।

‘আমার ভাই, আমাকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, এবং তারা আমাকে বলেছিল যে সে একজন ভাল লোক। প্রতিবেশীকে বিয়ে করছি দেখে, মা খুব খুশি ছিলেন। কারণ আমি তার কাছাকাছি থাকতে পারবো, সে আমার খোঁজ খবর নিতে পারবে।’

বাড়িতে বিয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই এলমিরা তার মা’কে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে তিনি এখনই বিয়ে করতে চাননা।

এলমিরার মা এই বিষয়টি আত্মীয় স্বজনদের জানিয়ে দিলে তারা এলমিরাকে চাপ দিতে থাকেন। অনেকেই সন্দেহ করছিলেন যে এলমিরা হয়তো কুমারী নন।

কিন্তু সত্যিটা হল বিয়ের রাতেই এলমিরা প্রথমবার যৌনমিলন করেছিলেন।

প্রথম রাতেই তিনি জানতে পারেন যে তার স্বামী তার অনুভূতি এবং আত্ম-সম্মানবোধকে বিন্দুমাত্র পরোয়া করেননা।

‘তিনি শুধু আমার উপর হামলে পড়েন, যখন আমার মাথা আলমারির সঙ্গে ধাক্কা লাগতে থাকে, তখনই শুনি দরজায় টোকা পড়ছে আর পাশের ঘর থেকে নারী কণ্ঠ ভেসে আসছে ‘অ্যাই আস্তে, চুপচাপ থাকো।’”- “বিষয়টা কি জঘন্য!”- বলেন এলমিরা।

আসলে দরজার পিছনে ছিলেন এলমিরার মা, দুই ফুফু/খালা, তার শাশুড়ী, এবং আরেকজন দূরবর্তী আত্মীয় (যিনি দরজায় টোকা দিয়ে চেঁচিয়েছিলেন)।

স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী বিয়ের রাতে বর কনের ঘরের বাইরে দুই পরিবারের সদস্যদের বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকতে হয়, যেন নববধূর কুমারীত্ব প্রমাণ করা যায়।

আমার সেই দূরবর্তী আত্মীয় ‘ইঙ্গি’ এর ভূমিকা পালন করছিলেন: ইঙ্গি বলতে বোঝায় এমন একজন বিবাহিতা নারীকে যিনি নবদম্পতির সঙ্গে বরের বাড়িতে যান।

তার কাজ হলো সারা রাত নবদম্পতির শোবার ঘরের পাশে বসে থাকা।

তার দায়িত্বগুলোর মধ্যে একটি হল পরামর্শ দেয়া।

ধারণা করা হয়, যৌনমিলনে অনভিজ্ঞ নববধূ হয়তো রাতের বেলা শোবার ঘরের বাইরে বেরিয়ে অভিজ্ঞ নারীদের থেকে পরামর্শ চাইতে পারেন।

ইঙ্গির আরেকটি দায়িত্ব হল বিয়ের প্রথম রাতের পর নবদম্পতির বিছানার চাদর সংগ্রহ করা।

‘আমি একইসঙ্গে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলাম আবার বিব্রত বোধ করছিলাম। ভাবছিলাম, বিয়ে মানে কি এগুলোই?’

‘বিয়ের রাত অনেকের জন্য রহস্যে ঘেরা থাকে’
বিয়ের প্রথম রাতের পরে যখন সকাল হয়, তখন বিছানার চাদর দেখাতে হয়। ককেশাসে এটাই বিয়ের একটি প্রচলিত প্রথা।

বিছানার সেই চাদরে রক্তের দাগ থাকলে, সব আত্মীয় স্বজনের সামনে প্রমাণিত হয় মেয়ের কুমারীত্ব। আর এর মাধ্যমেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার ইতি টানা হয়।

এই দাগ দেখার পরই পরিবারের সদস্যরা নব দম্পতিকে তাদের বিয়ের জন্য অভিনন্দন জানান।

কেননা, শুধুমাত্র এই কুমারীত্ব প্রমাণের মাধ্যমেই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়।

‘এ কারণে বিয়ের রাত অনেকের জন্য রহস্যে ঘেরা থাকে।- যে সকালে বিছানার চাদর কি অবস্থায় থাকবে।’ বলেন শখলা ইসমাইল, তিনি আজারবাইজানে নারীর অধিকার নিয়ে গবেষণা করছেন।

যদি চাদরে দাগ না থাকে, তবে নববধূকে একঘরে করা হয়। মেয়েটিকে ত্রুটিযুক্ত বলে তার মা-বাবার বাড়িতেও পাঠিয়ে দেয়া হয়।

তারপরে, ওই নারীকে তালাকপ্রাপ্ত বলে মনে করা হয়, এবং প্রায়শই এই নারীদের জন্য আরেকটি বিয়ে করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আর এসব কারণে মেয়েটিকে তার নিজ বাড়িতে মা বাবার নানা গঞ্জনা শুনে জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।

আজারবাইজানের মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন যে বিয়ের এই প্রথা দেশের গ্রামাঞ্চলে এখনও বিস্তৃত।

অনেক সময়, মেয়েটি এখনও কুমারী কিনা তা দেখতে ‘বিশেষজ্ঞ’ দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ২০টি দেশে এসব প্রথা এখনও চলছে বলে জানায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।

এ ধরণের প্রথাকে নারীদের জন্য অপমানজনক এবং আঘাতমূলক দাবি করে জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথাগুলো বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

তাছাড়া, চিকিৎসা বিজ্ঞানেও নারীর ‘কুমারীত্ব’ প্রমাণের বিষয়টিকে বানোয়াট হিসেবে ধরা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় চিন্তাভাবনায় বিদ্যমান।

বিশ্বের ২০টি দেশে এখনও বিছানার চাদর দেখে নববধূর কুমারীত্ব পরীক্ষার চল রয়েছে

‘ভয় পরিণত হয় লজ্জায়’

ভয়, ব্যথা, এবং লজ্জা- বিবাহের রাতকে, এই তিনটি অনুভূতি দিয়ে ব্যাখ্যা করেন এলমিরা।

‘সারা রাত আমি ভয় আর যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারিনি। আমার স্বামী এগুলো নিয়ে বিন্দুমাত্র পরোয়া করেননি। এরপর সকালে যখন ইঙ্গি, বিছানার চাদর নিতে আমার ঘরে আসেন- তখন রাতের ভয় কয়েকগুণ বেশি লজ্জায় পরিণত হয়।’

এই ঐতিহ্য প্রতি বছর নারীদের জন্য আরও মানসিক আঘাতমূলক হয়ে উঠছে বলে জানান মনোবিজ্ঞানী এলাডা গরিনা।

আজারবাইজানের কিছু গ্রামের পরিস্থিতি আরও গুরুতর। নেগার এমনই এক গ্রামে থাকতেন।

তার বিয়ের রাতে তার শোবার ঘরের পাশে কয়েকজন ‘পরামর্শদাতা’ নয়, বরং হাজির ছিল ‘পুরো গ্রাম’।

‘আমি জীবনে এর চাইতে বেশি বিব্রতকর অবস্থার মুখে পড়িনি। দরজার পিছনে এতো মানুষকে দেখে বিয়ের রাতে আমাদের দুজনের কারোই যৌনমিলনের কোনও ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু সকালে বিছানার চাদর দেখানোর চাপে আমরা বাধ্য ছিলাম।’

সেই সময় নেগারের বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। এখন তার বয়স ৩০, তালাকপ্রাপ্ত এবং রাজধানী বাকুতে বসবাস করছেন। তিনি তার আত্মীয়দের এখন ‘বিকৃত মনের’ বলে উল্লেখ করে।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের এমন হেনস্থার পরিবর্তন অনেক ধীরে আসছে বলে তিনি আক্ষেপ করেন।

‘লাল আপেল’

পার্শ্ববর্তী আর্মেনিয়া, জর্জিয়া এমন রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলেও বিছানার চাদর দেখার এই প্রথা প্রচলিত রয়েছে।

তবে আর্মেনিয়াতে দরজার বাইরে কোন সাক্ষী থাকেনা। সেখানে, ঐতিহ্যটিকে ‘লাল আপেল’ বলা হয়, যার মাধ্যমে কুমারীত্ব বোঝানো হয় আপেলের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দিয়ে।

রাজধানী ইরেভান শহরের বাইরে এই ঐতিহ্য এখনও চলছে। যাদের বেশিরভাগ কোন পরিবর্তন চাননা- এমনটাই বলছেন মানবাধিকার কর্মী নিনা কারাপেটিয়ানস।

তিনি বলেন, কখনও কখনও বাবা মায়েরা তাদের কন্যাকে ‘পবিত্র ও শুদ্ধ’ প্রমাণ করার জন্য তাদের সব আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ জানান। পুরো গ্রাম এই অপমানের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।

গ্রামে মেয়ের বয়স ১৮ হলেই তাদের বিয়ে দেয়া হয়। সে বয়সে বেশিরভাগের কোন দক্ষতা থাকেনা। যদি এই মেয়েটি আপেল পরীক্ষায় পাস না হয়, তার বাবা-মা তাকে ত্যাজ্য করতে পারে।

‘আমরা সেই রাতের ব্যাপারে কিছু বলিনা’

এলাডা গরিনার মতে, কিছু নারী এই ঐতিহ্যকে সহজভাবে সামলাতে পারলেও, বেশিরভাগ নারীকে বছরের পর বছর মানসিক ট্রমার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

‘এমনও ঘটনা আছে যে, চাদরে কোন রক্তের দাগ না থাকায় মাঝ রাতে স্বামীর পুরো পরিবার মেয়েটি কুমারী কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল,’।

একজন নারীর গোপনীয়তার ওপর এ ধরণের আক্রমণ তার ওপর সহিংসতার সামিল। কারণ এটি তাকে দীর্ঘমেয়াদে আক্রান্ত করে।

বিয়ের ছয় মাস পর এলমিরার স্বামী মারা যান। এই পুরো সময় তিনি তার বিয়ের প্রথম রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা কাউকে বলতে পারেননি।

এলমিরা বলেন, ‘আমি আবার বিয়ে করার জন্য এমনকি কারও সঙ্গে দেখা করার জন্যও প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু আমার আগের অভিজ্ঞতা আমাকে থামিয়ে দেয় … যদি আমার সেই অভিজ্ঞতা না থাকতো, তাহলে আমার আচরণ আজকে সম্পূর্ণ আলাদা হতো।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এই বিভাগের আরো খবর


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com