web stats ধর্ষকদের পা জড়িয়ে ধরেও রেহাই পায়নি নার্স তানিয়া, আসামীর স্বীকারোক্তি

বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

ধর্ষকদের পা জড়িয়ে ধরেও রেহাই পায়নি নার্স তানিয়া, আসামীর স্বীকারোক্তি

চলন্ত বাসে কিশোরগঞ্জে রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালের নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে পালাক্রমে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি স্বর্ণলতা পরিবহন বাসের চালক নূরুজ্জামান নূরু নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে ধর্ষক নূরু জানিয়েছে- সে ছাড়াও হেলপার বোরহান ও বাসের অন্য হেলপার লালন মিয়া নার্স তানিয়াকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে তাকে বাস থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

শনিবার সন্ধ্যায় বাসের চালক নূরুজ্জামানের জবানবন্দি রেকর্ড করেন কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল-মামুন। আদালত ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এদিকে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান জানান, নিহত তানিয়ার শরীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মাথার পিছনের আঘাত ছিল সবচেয়ে গুরুতর।

ভারি কিছু দিয়ে আঘাতের ফলে তার মাথার পিছনের খুলি ফেটে যায়। মাথার খুলি দুই ভাগ হয়ে যাওয়া ছাড়াও মাথার পেছনের দিকে দু’টি হাড় ভেঙ্গে যায়। গণধর্ষণ শেষে এই আঘাতের কারণেই তানিয়ার মৃত্যু হয়েছে।

তানিয়ার ময়নাতদন্ত রিপোর্টের বরাত দিয়ে তিনি (সিভিল সার্জন) এসব তথ্য জানান। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট রোববার পুলিশের হাতে জমা দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে পুলিশ সুপার মোঃ মাশরুকুর রহমান খালেদ, বিপিএম (বার) রোববার বিকেলে সাংবাদিকদের জানান, এখনো ময়নাতদন্ত রিপোর্ট তারা হাতে পাননি।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি শনিবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল-মামুন বাসচালক নূরুজ্জামান নূরুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে রাত ৮টার দিকে বাসচালক নূরুকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

বাসচালক নূরুজ্জামান নূরু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছে, সে নিজেসহ তিনজনে মিলে পালাক্রমে তানিয়াকে ধর্ষণ করে। অন্য দুই ধর্ষক হলো, বাসের হেলপার লালন মিয়া এবং নূরুর খালাতো ভাই ও বাসটির অপর হেলপার বোরহান।

তাদের মধ্যে লালন মিয়া গ্রেফতার হয়ে রিমান্ডে থাকলেও বোরহান এখনও পলাতক রয়েছে। বোরহানের বাড়িও গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায়। তাকে ধরতে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে।

দীর্ঘ জবানবন্দিতে মামলার প্রধান আসামি নূরুজ্জামান জানায়, গত ৬ মে বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে ঢাকার বিমানবন্দর স্টেশন থেকে তানিয়া তার বাসে ওঠে।

এরপর বাসটি টঙ্গী স্টেশন, গাজীপুর চৌরাস্তা, রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা, কাপাসিয়া, টোক হয়ে উজুলি আসলে অন্য ধর্ষক বোরহান বাসে ওঠে।

তারপর থানাঘাট, যাত্রাঘাট, বেতাল বাজার এলাকায় বাসের কিছু যাত্রী নেমে যায়। এরপর রাত ৮টার সময় বাসটি কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে আসে। সেখানে ২০ থেকে ২২ জন যাত্রী নেমে যায়।

নূরুজ্জামান জানায়, পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত হেলপার লালনকে বাসটি চালাতে বলি। কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড ছাড়ার সময় বাসটিতে আমি, হেলপার লালন, আমার খালাতো ভাই বোরহান, নিহত মেয়েটি এবং আরও দুইজন যাত্রী ছিল। কটিয়াদীর কদমতলীতে একজন এবং বাজিতপুরের উজানচরে অন্য একজন যাত্রী নেমে যায়।

এ সময় মেয়েটি বাসে একা বসে থাকে। আমি বাসের পেছনের সিটে বসে সিগারেট খেতে থাকি। লালন তখন মেয়েটিকে পেছনের সিট থেকে সামনের সিটে এসে বসার জন্য বলে। মেয়েটি তার সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র নিয়ে সামনের সিটে যাওয়ার সময় বোরহান তাকে ইচ্ছা করে ধাক্কা দেয়।

মেয়েটি তখন বোরহানের দিকে রাগান্বিত হলে বোরহান মেয়েটিকে জাপটে ধরে বাসের মাঝখানে যাত্রীদের চলাচলের পথে ফেলে দেয়। মেয়েটি এ সময় কান্নাকাটি শুরু করে।

বোরহান ধর্ষণের চেষ্টা চালালে একপর্যায়ে মেয়েটি বোরহানের পা ধরে কান্না শুরু করে। কিন্তু বোরহান আকুতি-মিনতি না মেনে মেয়েটিকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায়।

এ সময় মেয়েটি নিজেকে বাঁচাতে ধস্তাধস্তি শুরু করে। এ সময় হেলপার লালন বাস চালাচ্ছিল। একপর্যায়ে বোরহান মেয়েটির পায়ে আঘাত করে তাকে বাসের মধ্যে ফেলে দেয় এবং ধর্ষণ করে।

এ সময় গজারিয়া বিলপাড় এলাকায় একটি কলা বাগানের কাছে বাস থামিয়ে দেয় হেলপার লালন। বোরহান মেয়েটিকে প্রথমে ধর্ষণ করার পর নূরু মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণ শেষে সে বাসের চালকের আসনে গিয়ে বসলে লালন মেয়েটিকে ধর্ষণ করে।

এদিকে চলন্তবাসে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে গণধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় রোববার সরজমিনে ঘটনাস্থল বাজিতপুর উপজেলার বিলপাড় গজারিয়া এলাকা পরিদর্শন করেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বিপিএম-পিপিএম।

এ সময় ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপস এন্ড ইন্টেলিজেন্ট) মোঃ আসাদুজ্জামান বিপিএম (বার), পুলিশ সুপার মোঃ মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরাফাতুল ইসলাম, ভৈরব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার রেজুয়ান দিপু ডিআইজির সঙ্গে ছিলেন।

নিহত শাহিনুর আক্তার তানিয়া কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে। তিনি ঢাকার ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কল্যাণপুর শাখায় সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

কর্মস্থল ঢাকা থেকে বাড়িতে যাওয়ার জন্য গত ৬ই মে বিকেলে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৪২৭৪) ওঠেন শাহিনুর আক্তার তানিয়া।

সুত্রঃ নয়া দিগন্ত

এই বিভাগের আরো খবর