web stats "মাছ চাষে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে প্রথম-দ্বিতীয়ও হতে পারে"

সোমবার, ২০ জানুয়ারি ২০২০, ৭ মাঘ ১৪২৬

“মাছ চাষে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে প্রথম-দ্বিতীয়ও হতে পারে”

মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। এ অর্জন ৪ বছর পূর্বেই সম্পূর্ণ হয়েছে। গত অর্থবছরে ৪২.৫০ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। চলতি অর্থবছর শেষে এর পরিমাণ প্রায় অর্ধলাখ টনে ঠেকবে।

এখন চ্যালেঞ্জ বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ উৎপাদন। বিলুপ্ত ৬৪ প্রজাতির মাছ উৎপাদনে ব্যাপক সাড়া মিলছে। ইতিমধ্যে ১৯ প্রজাতির মাছ উৎপাদন ও চাষাবাদ প্রযুক্তি সম্পূর্ণ হয়েছে। বাকি বিলুপ্ত ৪৫ প্রজাতির মাছ উৎপাদনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ চলছে। বিলুপ্তপ্রায় মাছ ফিরিয়ে আনার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট ইতিমধ্যে ৬টি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছে। মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ এ দেশ মাছ উৎপাদনে বিশ্বের তৃতীয় স্থানে রয়েছে।

মৎস্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, মাছ চাষে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে প্রথম-দ্বিতীয়ও হতে পারে। ১৯৯০ সালে ১ লাখ ৯৩ হাজার টন মাছ উৎপাদন দিয়ে শুরু হয়। ২০০০ সালে তা বেড়ে হয় ৬ লাভ ৫৭ হাজার টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ লাখ মেট্রিক টন। মাছ উৎপাদন হয়েছে ৪১.৩৪ লাখ মেট্রিক টন। ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে মাছের মোট উৎপাদন ছিল ৭.৫৪ মেট্রিক টন। ৩৪ বছরের ব্যবধানে ২০১৭-১৮ সালে এই উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪২.৫০ লাখ মেট্রিক টন।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালকের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, মাছ চাষে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই। উৎপাদন আমাদের লাফিয়ে বাড়ছে। চলতি অর্থবছর শেষে এ সংখ্যা প্রায় অর্ধলাখ মেট্রিক টনে গিয়ে ঠেকতে পারে। তবে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ দেশীয় মাছের বিকল্প নেই। বিপন্ন প্রজাতির ও দেশীয় ছোট মাছের প্রজনন ও চাষ কৌশল উদ্ভাবনে বিএফআরআই ইতিমধ্যে সফলতা অর্জন করেছে। এখন চ্যালেঞ্জ বিলুপ্ত ৬৪ প্রজাতির মাছ উৎপাদন করা। তিনি বলেন, মাছে বৈপ্লবিক এ অর্জনের পেছনে রয়েছে জাত উন্নয়নের বিষয়টি। অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে জাত উন্নয়নের মাধ্যমে রুই, তেলাপিয়া, সরপুঁটি, কই, পাঙ্গাস মাছসহ বিভিন্ন প্রকার মাছ যথাক্রমে ৪ থেকে ৫৮ শতাংশ অধিক উৎপাদন করা হয়েছে।

ড. ইয়াহিয়া বলেন, জলজসম্পদে আমাদের দেশ সমৃদ্ধ। অতীতে এ দেশের নদনদী, খালবিল এবং প্লাবনভূমিসহ সব জলাশয়ে নানা প্রজাতির প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। পরবর্তীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিকাজে কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার, পানি দূষণ এবং জলাশয়ের অবক্ষয়সহ পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার কারণে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্য ক্রমশ হ্রাস পায়। আমরা ইতিমধ্যে বিলুপ্ত ১৯ প্রজাতির মাছ উৎপাদন করেছি। বাকিগুলোর উৎপাদনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

মাছগুলোর মধ্যে পাবদা, গুলশা, টেংরা, দেশি পুঁটি, চিতল, ফলি, মহাশোল, শিং, গুতুম, আইড়, বাটা, কুঁচিয়া অন্যতম। এসব প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ব্যবহার এবং নদ-নদী ও বিলে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ মাছের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে। বিলুপ্তপ্রায় মাছ ফিরিয়ে আনার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট ইতিমধ্যে ৬টি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছে।

মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দেশের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণে অনেক বড় ভূমিকা রাখছে মাছ। এ স্বয়ংসম্পূর্ণতা বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করছে। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম ভূমিকা ছিল ইলিশ মাছের। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৫ হাজার মেট্রিক টনে। বিশ্বে ইলিশের উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। বিশ্বের মোট ইলিশের ৭৫ ভাগ বাংলাদেশে উৎপাদন হয়।

মৎস্য চাষে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের মধ্যে তৃতীয়। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, মা ইলিশ রক্ষায় নদীর পরিবেশ, জাটকা সংরক্ষণ ও অভয়াশ্রম নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশে বছরে শুধুমাত্র ইলিশের বাণিজ্য ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এদিকে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ মৎস্য খাতে জড়িত, প্রায় ১২ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর ওপর নির্ভরশীল। মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্য রফতানিতেও অন্যতম বাংলাদেশ। ২০১৬ ১৭ অর্থবছরে মাছ রফতানি করে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদা আয় হয় ৪ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা।
বিপন্ন প্রায় মাছের প্রজাতির সংরক্ষণ, অবাধ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে মাছের উৎপাদন আরও বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার ফলে বিলুপ্তপ্রায় এবং বিপন্ন ও দুর্লভ প্রজাতির মাছ, যথা একঠোঁট, টেরিপুঁটি, মেনি, রানী, গোড়া গুতুম, চিতল, ফলি, বামোস, কালিবাউশ, আইড়, টেংরা, সরপুঁটি, মধু পাবদা, রিঠা, কাজলি, চাকা, গজার, বাইম ইত্যাদির তাৎপর্যপূর্ণ পুনরাবির্ভাব ও প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অভয়াশ্রমে দেশি কই, শিং, মাগুর, পাবদা ইত্যাদি মাছের পোনা ছাড়ার ফলে এসব মাছের প্রাচুর্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে গত কয়েক দশকে দেশে চাষ করা মাছে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, চীনের উদ্ভাবিত মাছের জাত বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে। মাছের উৎপাদন বাড়ার কিছু কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন, শিক্ষিত তরুণেরা চাকরির দিকে না ঝুঁকে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এ ছাড়া সরকার এবং ব্যাংকগুলো মাছ ও কৃষিকাজে সহজ শর্তে ঋণ দেয়া অন্যতম। ফলে মাছের দিকে মানুষ ঝুঁকেছে। গ্রামে গ্রামে মাছের চাষ আনন্দ পরিবেশে চাষ করা হচ্ছে।

মৎস্য অধিদফতেরর মহাপরিচালক আবু সাঈদ মো. রাশেদুল হক জানান, আমরা আমাদের হারানো মাছ ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছি। মাছে-ভাতে বাঙালি, এ স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশ মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়, ইলিশে প্রথম। মাছের জাত উন্নয়নে আমরা একের পর এক সফল হচ্ছি। কিছু কিছু মাছ ৪ থেকে ৫৮ শতাংশ অধিক উৎপাদন করছি। একই সঙ্গে স্বাদুপানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ৬৪ প্রজাতির মাছ উৎপাদনে সম্মিলিতভাবে কাজ করছি। দেশীয় এসব মাছ পুষ্টিগুণে অনন্য, নারী, শিশুসহ গর্ভবতী মায়ের জন্য দেশীয় এসব মাছ খুবই উপকারী। তিনি বলেন, দেশে মাছ চাষে বৈপ্লবিক অর্জন এসেছে তার প্রমাণ ২০০০ সালে ৬.৫৭ লাখ মেট্রিক টনের স্থানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪২.৫০ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। চলতি অর্থবছর শেষে এর পরিমাণ প্রায় অর্ধলাখ টনে ঠেকবে।

এই বিভাগের আরো খবর


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com