web stats শুধু মাত্র ব্যাট তৈরি করে এখন লাখ পতি।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৯ আশ্বিন ১৪২৭

শুধু মাত্র ব্যাট তৈরি করে এখন লাখ পতি।

শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। স্বরূপকাঠির বিন্না গ্রামের বেকার আবদুল লতিফ ও তার শ্যালক আবুল কালাম কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন রাজধানী ঢাকায়। কাজ পেয়েছিলেন ঢাকা স্টেডিয়ামের এক খেলার সামগ্রী বিক্রেতার কারখানায়। দুই বছরের মতো কাজ করার পর আবার ফেরেন গ্রামে। তারপর শুরু করেন ক্রিকেট ব্যাট তৈরির স্বপ্নের কারবার। সেই স্বপ্নই এখন ডালপালা মেলে স্বনির্ভর করে দিয়েছে পুরো এলাকাকে। নিজেদের তৈরি ব্যাট ঢাকায় নিয়ে বিক্রি শুরুর পরই এসেছে পরিবর্তন।

পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার পশ্চিম প্রান্তের বলদিয়া ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম বিন্না। দারিদ্র্যপীড়িত ওই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ একসময় কাজের সন্ধানে ছুটতেন উপজেলা সদর স্বরূপকাঠি ও ইন্দুরহাট বন্দরে। এখন আর ছুটতে হয় না। বিন্না গ্রামেই এখন কাজের জন্য ছুটে আসে মানুষ। সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মধ্যমে কুটির শিল্পেও নাম করেছে বিন্না। কালাম-লতিফের হাত ধরে যে কাজের শুরু, তা এখন বিস্তৃত হচ্ছে। ক্রিকেট ব্যাট পল্লীর পরিধি এখন বিন্না ছাড়িয়ে উরিবুনিয়া, চৌদ্দরশি, কাটাখালী, খেজুরবাড়ী, ডুবি গ্রাম পর্যন্ত। প্রতিটি কারখানায়ই চলছে উন্নতমানের ব্যাট তৈরির প্রতিযোগিতা। কারখানার মালিক ফায়জুল, সাহাবুদ্দিন, নুর হোসেন জানান, একসময় ক্রিকেট ব্যাট তৈরিতে ব্যবহূত হতো সুন্দরবনের গেওয়া কাঠ। অত্যন্ত হালকা ও ভঙ্গুর হওয়ায় ভালো দাম পাওয়া যেত না। চাহিদাও ছিল কম। তাই এখন ব্যবহূত হচ্ছে ছাতিয়ান, কদম, নিম ও শিশু কাঠ। আগে হাতল ও বডি তৈরি হতো আলাদা। এখন উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে একই কাঠে তৈরি হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ ব্যাট। এসব ব্যাট যেমন মজবুত, তেমনি অনেক বেশি টেকসইও। স্বরূপকাঠি মুক্তিযোদ্ধা চরবাজার, স্বরূপকাঠি পাইলট বিদ্যালয়ের সামনের কাঠের বাজার এবং মিয়রহাট-ইন্দুরহাটের বিভিন্ন স্থানের কাঠের আড়ত থেকে সংগ্রহ করা হয় কাঠ। এরপর স’মিলে চেরাই করে কারখানায় নেওয়ার পর ব্যাটের আকৃতিতে সাইজ করে তৈরি হয় ক্রিকেট ব্যাট। দুই শতাধিক কারখানায় প্রায় সহস্রাধিক শ্রমিক কাজ করেন। তা ছাড়া কাঠ সংগ্রহ, কাঠ চেরাই, পরিবহনসহ বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে আছেন প্রায় পাঁচ শতাধিক শ্রমিক। সেসব কারখানায় তৈরি ক্রিকেট ব্যাট বিক্রির প্রধান বাজার ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাছে কুতুবখালী মার্কেট। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা এসব কারখানা থেকে ব্যাট কিনে বিভিন্ন মাহফিল ও মেলায় নিয়ে বিক্রি করেন। উরিবুনিয়া গ্রামের কারখানা মালিক জাহাঙ্গীর, হুমায়ুন কবির, চৌদ্দরশি এলাকার শাহজাহান আর বিন্না গ্রামের ব্যাট তৈরির পথিকৃৎ ব্যাবসাহী আবুল কালামই শুধু নন, গৃহকর্তার পাশাপাশি তাদের স্ত্রীরাও ওই কাজে সমান তালে অংশ নিচ্ছেন। স্বামীর সঙ্গে ব্যাট তৈরি করায় অংশ নিয়ে আবুল কালামের স্ত্রী নিলুফার ইয়াসমিন পেয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি। ক্ষুদ্র কুটির শিল্প স্থাপনের জন্য তিনি পুরস্কৃতও হয়েছেন। পিকেএসএফের সহায়তায় গ্রামীণ ব্যাংক ও পদক্ষেপ মানব উন্নয়নের (এনজিও) মাধ্যমে কানাডার হলিফ্যাক্সও ঘুরে এসেছেন নিলুফার।

ব্যাট তৈরি কীভাবে বদলে দিয়েছে বিন্না গ্রামের মানুষের জীবন তা ২৭ বছর বয়সী আসাদুল হকের সঙ্গে কথা বললেও বোঝা যাবে। আসাদুলের আছে রমজান স্পোর্টস কারখানা। সেখানে ঢুকতেই কথা হয় তার সঙ্গে- ‘একসময় বাবাকে নিয়ে কাজ করতাম আইজুদ্দিনের কারখানায়। সেখান থেকে কাজ শিখে ২০১২ সালে নিজেই কারখানা গড়ে তুলি। দুই লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে প্রথমে ব্যবসা শুরু করি। পরে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছি।’ পাঁচ বছরে এখন আসাদুলের নিজের পুঁজি দাঁড়িয়েছে সাত লক্ষাধিক টাকা। আসাদুল হক জানান, জোড়া দেওয়া ব্যাটের পাশাপাশি এক কাঠে (হাতল-বডি) নতুন পদ্ধতিতে ব্যাট তৈরি শুরু করেছেন। তিনি প্রতি মাসে দু’বার ঢাকায় ব্যাট পাঠান। ব্যাটে ডেকোরেশন করেন না। পাঁচটি ভিন্ন সাইজের ব্যাট তৈরি করেন কারখানায়। বড়গুলো ১৫০ টাকা এবং ছোটগুলো ৩৫ টাকায় বিক্রি করেন। আসাদুলের কারখানায় তিনি ও তার স্ত্রী ছাড়াও আছেন চার কর্মচারী। যাদের একজনের সর্বোচ্চ মাসিক বেতন ১০ হাজার টাকা। অন্য তিনজনকে দেওয়া হয় সাত হাজার টাকা করে।

আসাদুলের কারখানা থেকে পশ্চিম দিকের রাস্তায় ঢুকেই দেখা গেল বাড়ির উঠানে ধাপে ধাপে সাজানো ক্রিকেট ব্যাট। রোদে শুকিয়ে হালকা করা হচ্ছে। বিন্না খালের পশ্চিম পাড়ে আবির স্পোর্টস কারখানা। যেখানে তৈরি ব্যাট ঢাকায় পাঠানোর জন্য প্যাকেটজাত করা হচ্ছিল। রঙবেরঙের বিভিন্ন নামের স্টিকার দিয়ে সাজানো ক্রিকেট ব্যাট দেখালেন কারখানার মালিক মহিউদ্দিন। সেখানে তৈরি ব্যাট বস্তায় প্যাকেট করে ট্রলারে ইন্দুরহাট ঘাটে নিয়ে ঢাকাগামী লঞ্চে করে ঢাকায় পাঠানো হবে বলে জানালেন তিনি। তবে ব্যাট তৈরির কারখানা এলাকার জীবন-মান বদলে দিলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়নি। সরু রাস্তা, পুলগুলো নড়বড়ে, খালগুলো নাব্য হারিয়ে শুকিয়ে গেছে। মালপত্র পরিবহনের জন্য জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে চলতে হয়। বলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, ‘বিন্না বলদিয়া ইউনিয়নের চেহারাই পাল্টে দিয়েছে। বিন্না বাজার থেকে বটতলা সড়ক-পুলগুলো মেরামতসহ রাস্তা প্রশস্তকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। খালগুলোর ব্যাপারে এ মুহূর্তে কোনো পরিকল্পনা নেই।’ তবে কর্তৃপক্ষ চাইলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করে এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারেন।

এই বিভাগের আরো খবর


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com