web stats এক পা নেই তবু স্বপ্নপূরণে এক পায়ে ছুটছে রাজিব

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ৫ কার্তিক ১৪২৭

এক পা নেই তবু স্বপ্নপূরণে এক পায়ে ছুটছে রাজিব

তখন প্রথম শ্রেণিতে পড়েন রাজিব। অনেক কিছুই বোঝেন না। সেসময় তার পায়ে ধরা পড়ে টিউমার। কিন্তু ভুল চিকিৎসায় হারাতে হয় বাম পা। এরপর থেকেই এক পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলাফেরা করতে হয় রাজিবকে। তবুও থেমে নেই রাজিবের পথচলা। প্রবল ইচ্ছা শক্তিকে সঙ্গী করে শারীরিক প্রতিবন্ধীকতাকে হার মানিয়ে স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

রাজিব দেবনাথ সুনাগঞ্জের কাটাখালী বাজারস্থ মিতালী পাবলিক হাইস্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ৩.৫৬ গ্রেড পেয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। বর্তমানে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার চুন্ড্রীপুর গ্রামে। রাজিবের বাবা বৃদ্ধ প্রভাত দেবনাথ একজন অবৈধ দুবাই প্রবাসী।

রাজিব বিয়ানীবাজার পৌরসভাস্থ নয়াগ্রামের শিশির বাবুর বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসেবে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। বিনিময়ে শিশির বাবুর ছোট ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা অদ্যোপান্ত দেখভালের দায়িত্ব তার। প্রতিদিন লজিং বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার পথ এক পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে কলেজে যাওয়া-আসা করেন রাজিব।

বন্ধুর এ পথকে স্বপ্নপূরণের সিঁড়ি হিসেবে বেছে নেওয়া রাজিবকে হয়তো এবার থামতে হবে অর্থাভাবের কারণে। পড়াশোনা এখন প্রায় বন্ধের পথে। কলেজে এইচএসসি প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নিলেও এখনও দ্বাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারেননি। আদৌ ভর্তি হতে পারবেন কিনা, এর কোনো উত্তর তার জানা নেই।
এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখার খরচ মামা বহন করেছেন। বর্তমানে দু্ই একটা টিউশনি করে নিজের খরচ নিজেকেই চালাতে হয় তাকে। খরচ চালাতে গিয়ে দ্বাদশ শ্রেণিতে ভর্তি এবং সবকটি বই কেনা হয়নি। এমনকি এইচএসসি পরীক্ষার জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন কিনা তাও তার কাছে স্পষ্ট নয়।

প্রতিবন্ধী রাজিব দেবনাথ বলেন, ‘২০১৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য সিলেট বিভাগের ৫টি কলেজে আবেদন করলে বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে ভর্তির সুযোগ পাই। এক বন্ধুর সহায়তায় বিয়ানীবাজার আসলে পৌর শহরের পন্ডিতপাড়া মন্দিরে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়। মন্দিরে দিনরাত মানুষের আনাগোনায় আমার পড়াশোনা হচ্ছিল না মোটেও। যার ফলে এক কাকার সহায়তায় শিশির বাবুর বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসেবে থাকার সুযোগ পাই। শিশির বাবু এবং উনার স্ত্রী আমাকে সন্তানতূল্য স্নেহ করেন, খেয়াল রাখেন।’
রাজিব জানান, পরিবারের চার ভাই-বোনের মধ্যে বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, তারপরেই রাজিব। ছোট ভাই অর্থাভাবে পড়ালেখা বাদ দিয়ে এখন দর্জির কাজ শিখছে। আর ছোট বোন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। তার বৃদ্ধ বাবা মাস তিনেক পরপর যতটুকু পারেন পরিবারের জন্য টাকা পাঠান। কিন্তুই তাতে পরিবারের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা।

রাজিবের মা দিপালী রাণী নাথ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ছেলেটা লেখাপড়ায় ভালো করলেও টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় অনেক বই কিনে দিতে পারছি না। এমনকি তার খরচ বহন করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
রাজিবের বন্ধুরা জানায়, রাজিব পূর্বে নিয়মিত ক্লাস করতে পারত না, শুধু গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস এবং পরীক্ষায় উপস্থিত থাকার চেষ্টা করত। বর্তমানে সে পৌর শহরের লজিং থাকার সুবাধে প্রতিদিন ক্লাস করার জন্য নানা ঝামেলা পেরিয়ে ছুটে আসার চেষ্টা করে।

রাজিবের বন্ধু মুবাশশির আলম প্রিয়.কমকে জানায়, ‘ছেলেটির মধ্যে পড়ালেখার প্রতি অদম্য ইচ্ছা রয়েছে। পড়ালেখার প্রতি সে খুবই মনোযোগী। বিয়ানীবাজারে লজিং থাকার সুবাধে প্রতিদিন নয়াগ্রাম থেকে এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে অনেক কষ্ট করে কলেজে আসা–যাওয়া করে। সে নিয়মিত ক্লাস করে, যেখানে অনেক ছাত্রই প্রতিদিন ক্লাস করে না।’

বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ দ্বারকেশ চন্দ্র নাথ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা রয়েছে। সে যদি আমাদের কাছে আর্থিক সহায়তা ও বিনা খরচে অধ্যয়নের জন্য লিখিত আবেদন করে তাহলে আমরা তার সহায়তায় এগিয়ে আসব।’
তবে রাজিব নিজেকে কোনোভাবেই পিছিয়ে পড়া ভাবতে রাজি নয়। সে আর দশজনের মতোই সব কাজ করতে পছন্দ করে। লেখাপড়া শেষ করে একটা ভালো চাকরি জোগাড়ের মাধ্যমে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চান তিনি।

যখন অন্যদের খেলতে দেখেন, তখন কী আফসোস হয়? এমন প্রশ্নের জবাবটা রাজিবের মুখেই শোনা যাক, ‘তা কেন লাগবে? আমি তো সব কাজ করতে পারি। আমি এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটতে পারি, বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি করতে পারি, সাঁতার কাটতে পারি। আমি সবই করতে পারি। শারীরিক অক্ষমতার জন্য যে কাজ করতে পারি না, সেটি মনের জোরেই করে ফেলি’, বলেই একগাল হাসি দিলেন। তার হাসিতেই ফুটে ওঠে সংগ্রামী রাজিবের মানসিক দৃঢ়তা।

এই বিভাগের আরো খবর


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com