web stats পুরোনো পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল উৎপাদন হচ্ছে এবং পলিথিনের তেলে চলছে মোটরসাইকেল!

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৭ আশ্বিন ১৪২৭

পুরোনো পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল উৎপাদন হচ্ছে এবং পলিথিনের তেলে চলছে মোটরসাইকেল!

মোটরসাইকেল কিনলেন। জ্বালানি তেলের জন্য দৌড়াতে হবে না কোনো পাম্পে। পলিথিন পুড়িয়ে তেল হয়। ওই তেল দিয়ে চলবে আপনার মোটরসাইকেল! বাংলাদেশেরই এক তরুণ ফেলে দেওয়া পলিথিন থেকে বানিয়েছেন জ্বালানি তেল! ওই তেলে চলছে মোটরসাইকেল।

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৭’তে নিজের ওই উদ্ভাবন নিয়ে এসেছিলেন তৌহিদুল ইসলাম। তিনি জামালপুরের বাসিন্দা। আয়োজনের শেষদিন গতকাল শনিবার এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা হয় তৌহিদুলের।

তৌহিদুল পুরোনো পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল উৎপাদন করেছেন। কেবল তেল না, মিথেন গ্যাস ও ছাপাকাজে ব্যবহারের জন্য কালিও বানিয়েছেন ওই পলিথিন থেকে!

ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক থেকেও একইভাবে জ্বালানি তেল তৈরি করেছেন তৌহিদুল। তিনি জানান, ২০১১ সালে তিনি সফলভাবে প্রথম তেল উৎপাদন করতে পারেন।

তৌহিদুলের দাবি এসব তেল ও গ্যাস দিয়ে নানাকাজ খুব সহজে করা যায়। পলিথিন থেকে উৎপাদিত তেল দিয়ে মোটরসাইকেলও চালান তিনি! ২০১২ সাল থেকে ওই মোটরসাইকেলটি চালান তিনি।

তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ১০০ কেজি পলিথিন থেকে ৭০ কেজি জ্বালানি তেল, ১০ কেজি মিথেন গ্যাস ও ২০ কেজি ছাপাকাজের কালি তৈরি করা যায়। ১ কেজি জ্বালানি তেলের খরচ পড়বে ১৭ টাকা। তবে পলিথিন ও প্ল্যাস্টিক কেনার ওপর এই দাম নির্ভর করে বলে তিনি জানান।

তৌহিদুল ইসলামের বয়স মাত্র ২৫। ছিপছিপে গড়নের। ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে’ সাদা শার্ট আর মেটে রঙের প্যান্ট পরে নিজের উদ্ভাবন নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তৌহিদুল। তাঁর সামনে টেবিলে রাখা গ্যাস সিলিন্ডারের মতো একটা জিনিস রাখা। আর তাতে যুক্ত আছে কিছু পাইপ। আর ওই টেবিলেই আছে তিনটি বোতল। দুই বোতলে কালচে ধরনের তরল। আর অন্য বোতলে হালকা হলুদ রঙের তরল। তৌহিদুল জানান, পলিথিন পুড়িয়ে প্রথম যে তেলটা আসে সেটা ওই কালচে রঙের। পরিশোধিত করার পর তা দেখতে হয়ে যায় হলুদ রঙের! পরিশোধন করার জন্য কোথায় যেতে হবে? তৌহিদুল জানালেন তাঁর উদ্ভাবিত যন্ত্র পরিশোধনও করে দেবে!

ফুলের বাগান বাঁচাতে!‍

ফুলের বাগান ছিল তৌহিদুল ইসলামের। কিন্তু ফেলে দেওয়া পলিথিন ব্যাগের কারণে গাছগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। বাগান রক্ষা করতে গিয়ে পলিথিন নিয়ে ভাবলেন। প্রথমেই চিন্তা ছিল কীভাবে ওই উচ্ছিষ্ট পলিথিনগুলো নষ্ট করা যায়। পরেই ভাবনা হলো, কীভাবে এসব পলিথিন কাজে লাগানো যায়। তখন তৌহিদুল মাত্র চতুর্থ শ্রেণিতে পড়েন!

ওই ইচ্ছে আর ভাবনা থেকে সরে আসেননি তৌহিদুল। স্কুল ও কলেজে রসায়ন নিয়ে পড়েছেন। আর তত্ত্বীয় জ্ঞানের সঙ্গে ব্যবহারিক বিষয়টিও মেলালেন।

যেভাবে পলিথিন থেকে হয় তেল

তৌহিদুল বলেন, ‘ক্লাসে রসায়ন নিয়ে পড়ার সময় দেখলাম যে পলিথিন এক ধরনের হাই টেমপারেট হাইড্রোকার্বন আর জ্বালানি তেল লো টেমপারেট হাইড্রোকার্বন। এখন একটি হলো হাইড্রোজেন ও কার্বনের চেইন, আরেকটি সরল একটি গঠন।

কলেজে রসায়নের প্রভাষক একরামুজ্জামান ও তাঁর খালাতো ভাই মনিরুজ্জামান মনি বিভিন্ন সময় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। মুলত এই দুজনের সহযোগিতার কারণে যন্ত্রটি বানিয়েছেন তৌহিদুল।

তৌহিদুল বিবরণ দিলেন যন্ত্রের প্রক্রিয়ার। প্রথমে চেম্বারে (সিলিন্ডারের মতো দেখতে বস্তুটি) পলিথিন দিতে হয়। এমন ভাবে তা করা হয় যাতে বাইরে থেকে অক্সিজেন ঢুকতে না পারে। যেন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা কার্বন মনো-অক্সাইড তৈরি করতে না পারে। এরপর ৩৫০ থেকে ৭৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। ৭৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে যখন উত্তপ্ত করা হয়, তখন পলিথিনের যে কার্বন ডাই-অক্সাইড চেইন আছে সেটা ভেঙে গিয়ে প্রচণ্ড চাপের বাষ্প হয়ে নল দিয়ে বের হয়। এরপর ঠাণ্ডা তরল হয়ে বোতলে জমা হয়। আর এখানে যে মিথেন গাস তৈরি হয় তা আবার এই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়। তরল জ্বালানি বের করে আনার পর সেখানে অনেক মুক্ত কার্বন তৈরি হয়, যা পড়ে ছাপার কাজে কালি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

‘পরিবেশ রক্ষা করাই একমাত্র উদ্দেশ্য’

তৌহিদুল ২০০৯ সালে জামালপুরের নারিকেলি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। জামালপুর শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং করেন জামালপুর কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং পলিটেকনিক থেকে।

জামালপুর সদরের কেন্দুয়া ইউনিয়নের কোজগড়ের মঙ্গলপুরে তৌহিদুলের বাড়ি। তাঁর বাবার নাম আবদুল মান্নান ও মা হালিমা খাতুন। আপাতত নিজের উদ্ভাবন নিয়েই কাজ করছেন তিনি। পাশাপাশি টিউশনি করান। তাঁরই এক ছাত্র সিফাত উল্লাহ তাঁকে সহযোগিতা করেন।

তৌহিদুল জানান, এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাণিজ্যিক ভাবে এই জ্বালানি তেল উৎপন্ন করার। তবে এই তরুণ উদ্ভাবক বলেন, ‘কেবল অর্থ উপার্জন নয়। পলিথিন ধ্বংস করে পরিবেশ রক্ষা করাই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে যদি কেউ এ কাজ করতে চায় তবে আমিও তাদের সঙ্গে কাজ করতে চাই।’

এই বিভাগের আরো খবর


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com